সামাজিক সংগঠনের ভুমিকা এবং বাস্তবতা
একথা ধ্রুব সত্য যে, এসব সংগঠন গুলি যদি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ করতো তাহলে, শিক্ষা, সংষ্কৃতি, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচনে বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারতো। ফলশ্রুতিতে সার্বিক সামাজিক উন্নয়ন হতো, এমন কি সামজিক শান্তি শৃংখলা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেত। এক কথায় বলা যায় সামাজিক উন্নয়নে, সামাজিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারতো; যদি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ করতো।
কিন্তু বেশীরভাগ সংগঠনের ক্ষেত্রেই বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্পেনের প্রবাসীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত জেলা, থানা, ইউনিয়ন, এমন কি গ্রাম ভিত্তিক সংগঠনের অভাব নাই। একটু ভাবুন, সকলের উদ্দেশ্য যদি হয় সামাজিক উন্নয়ন, তাহলে একই জেলা, থানা বা ইউনিয়িনের একাধিক সংগঠন কেন?
কোন সংগঠনকে ব্যক্তিগত ভাবে আক্রমণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
বেশীরভাগ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের অলিখিত মূখ্য উদ্দেশ্য থাকে পদবী লাভ করা। সভাপতি, সেক্রেটারি বা কার্যকরী কমিটিতে একটি পদ চাই! এদের ধারণা এসব পদবীর প্রচারে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সংগঠনে পদবী থাকার কারনে দেশে বিদেশে সমম্বর্ধনা পাওয়া যায়। আর যখই এই কাংখিত পদবী পাওয়া যায় না, তখনই উন্নয়নের উদ্দেশ্য চলে যায় ডাস্টবিনে। শুরু হয় গ্রুপিং, ফলশ্রুতিতে একই থানা বা ইউনিয়ন ভিত্তিক আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাও সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ।
অনেক সংগঠন আবার সামাজিক উন্নয়নের পরিবর্তে সম্মাননা ও পদবী বানিজ্যে লিপ্ত। এদের সম্মাননা পদবী বানিজ্যের চাপে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে অপসংষ্কৃতি। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মোটা অংকের দানের বিনিময়ে বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে নির্বিচারে বিভিন্ন উপাধি দেওয়া হয়; যোগ্যতার বিচারে নয়। কৃতি, বিশিষ্ট, সমাজপতি, শিল্পপতি থেকে শুরু করে রত্ন, সাগর, আকাশ, বাতাস… যা ইচ্ছা তাই সম্মাননা পদবী দিতে পারে। অসুবিধা নেই, ক্লিনার, ড্রাইভার, বাবুর্চি যে কেউ টাকা দিলেই এসব সংগঠন থেকে যে কোন সম্মাননা উপাধী পেতে পারে। এখানে একটি কথা বলতে চাই, প্রকৃত গুণীজন বা যুগ্যতম দেরকে সম্বর্ধিত করতে আমি উৎসাহী, এতে অনুপ্রেরণা বৃদ্ধি পায়।
সম্মাননা প্রাদান, গ্রহন ও নামের সাথে উপাধী লিখার নিয়ম সম্পর্কে অনেক সংগঠন ও ক্রেতা আসলেই অজ্ঞ। কোন সম্মাননা মূলক উপাধী আইনানুগ ভাবে বৈধতার জন্য নিম্নোক্ত তিনটি শর্ত বাধ্যতামূলকভাবে পূরণ করতে হবে।
প্রথমত: সম্মাননা উপাধী রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্মাননা প্রদান করতে হবে।
তৃতীয়ত: সম্মাননা উপাধীর সনদ থাকতে হবে, যা আইনানুগ অনুমোদিত ব্যক্তি কর্তক স্বাক্ষরিত হতে হবে।
এই শর্ত সমুহ পূরণ না করে কেউ সম্মাননা উপাধী দিলে এবং কেউ নামের সাথে কোন সম্মাননা উপাধী ব্যবহার করলে, তা যে কোন দেশের আইনানুসারে দণ্ডনীয় অপরাধ এবং যে কোন নাগরিক এর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।
অথচ আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, যে সব সামাজিক সংগঠন সম্মাননা বানিজ্যে লিপ্ত এদের ৯৫% এর দেশে বা বিদেশে আইনানুগ রেজিস্ট্রেশন ই নাই। অর্থাৎ সংগঠনেরই আইনানুগ বৈধতা নাই। এদিক থেকে এগুলিকে হাইব্রিড সামাজিক সংগঠন বললেও ভুল হবে না। যার নিজেরই আইনানুগ বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে তার দেওয়া সম্মাননার বৈধতা কতটুকু তা পাঠকরাই বিবেচনা করবেন।
আশার আলো একেবারে নিভে যায় নাই; কয়েকটি সংগঠন যে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করছে না, তা কিন্তু নয়।
উন্নউনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেলে সামাজিক সংগঠন সত্যিকার অর্থেই সার্বিক সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। এর শত শত প্রমাণ আছে, কতিপয় সামাজিক সংগঠন সরকারের সহযোগীতা ছাড়াই নিজের এলাকা বা গ্রামকে আদর্শ এলাকা বা গ্রামে রুপান্তরিত করেছে। তাই আমদের সকলের উচিৎ হবে, সভাপতি, সেক্রেটারি ইত্যাদি পদবীর লোভ বিসর্জন দিয়ে, সম্মাননা উপাধী বানিজ্যের চিন্তা না করে; সত্যিকার উন্নয়নমূলক কাজের সংকল্প নিয়ে সংগঠন করা। তা করতে পারলেই সম্ভব হবে সমাজের উন্নয়ন করা। নিজের এলাকা বা গ্রামকে আদর্শ এলাকা বা গ্রাম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। আর সাধারণ মানুষ ও সম্মানের সাথে সংগঠনকে স্মরণ করবে অনন্ত কাল।


No comments