তিন যুগের অপেক্ষার এক অসমাপ্ত প্রেম
১৯৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার পরের বছর। আমি তখন মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি। আমাদের গ্রাম পাহাড়ি এলাকায়। চারদিকে সবুজে ঘেরা উঁচু-নিচু টিলা, বাঁশঝাড় আর ছোট ছোট পাহাড়। বর্ষায় কাদা হতো, কিন্তু বন্যার পানি আমাদের গ্রামে উঠত না। অথচ আমাদের পাশের ইউনিয়নটি ছিল নদীর তীরবর্তী নিচু অঞ্চল। ১৯৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যায় নদী যেন মানুষের ঘরবাড়ি নয়, তাদের স্বপ্নগুলোও ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ষাট শতাংশ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। এক রাতেই অসংখ্য মানুষ হয়ে যায় গৃহহীন। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা আশ্রয় নেয় আমাদের গ্রামে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ স্কুলে, কেউ খালি জায়গায় বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে ছোট্ট একটি ঘর তুলে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছিল।
সেই মানুষগুলোর মধ্যেই ছিল মনজিলাদের পরিবারও। গ্রামের টগবগে যুবক মজিদের বয়স তখন ২৭-২৮ বছর। পরিশ্রমী, হাসিখুশি আর স্বপ্নবাজ একজন মানুষ। একদিন হঠাৎই তার চোখ পড়ে মনজিলার ওপর। বয়স ২২-২৩ হবে। বড় বড় মায়াভরা চোখ, মুখে লাজুক হাসি। বন্যা তাদের ঘর কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু তার মুখের কোমলতা কেড়ে নিতে পারেনি।
প্রথম দেখাতেই মজিদের মন হারিয়ে গেল। কয়েক মাসের পরিচয়, তারপর ভালোবাসা। শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হলো। খুব জাঁকজমক ছিল না, কিন্তু ছিল আন্তরিকতা। ছোট্ট সংসার, অল্প আয়, তবুও সুখের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু সুখের দিনগুলো খুব বেশি দীর্ঘ হলো না। বন্যার পানি কমে গেল। আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো আবার নিজেদের ভিটেতে ফিরে গেল। মনজিলা রয়ে গেল, তবে এবার অতিথি হিসেবে নয় মজিদের স্ত্রী হয়ে।
তখনই দেশে নেমে এলো তীব্র অর্থনৈতিক সংকট। সংসারের অভাব প্রতিদিন বাড়ছিল। এক বছর না পেরোতেই মজিদ কঠিন সিদ্ধান্ত নিল বিদেশে যাবে, তখন পাকিস্তানের খুব কম খরচেই যাওয়া যেত এবং সহজ ছিলো, মজিদও তাই সিদ্ধান্ত নিলো পাকিস্তান যাবে। বিদায়ের দিন মনজিলা শুধু একটি কথাই বলেছিল, “টাকা কম আনলেও চলবে, কিন্তু বেশি দিন থাকবেন না। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন।” মজিদ শুধু মাথা নেড়েছিল। সে জানত না, সেই “তাড়াতাড়ি” শব্দটি একদিন ৩ যুগ অপেক্ষায় পরিণত হবে।
আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমাদের স্কুল প্রতিদিন বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে ছুটি হতো। তবে মঙ্গলবার স্কুলের মাঠে বাজার বসত তাই আমাদের ৪টা ১৫ মিনিটেই ছুটি দিয়ে দিত। প্রতি মঙ্গলবার সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে মনজিলা চাচি আমাকে ডেকে বলতেন, “আব্বা, আজকে আসার সময় পোস্ট অফিসে একটু খোঁজ নিও তো, তোমার চাচার কোনো ইংল্যান্ড লেটার এসেছে কিনা।” স্কুল ছুটির পর আমি বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সোজা পোস্ট অফিসে চলে যেতাম। পোস্টমাস্টার চাচা আমাকে দেখেই বুঝে যেতেন আমি কেন এসেছি। রেজিস্টার উল্টে-পাল্টে দেখে ধীরে ধীরে বলতেন, “না বাবা, আজও কোনো চিঠি আসেনি। আমি নীরবে ফিরে আসতাম। মনজিলা চাচি দূর থেকে আমাকে দেখেই বুঝে যেতেন। আমি কিছু বলার আগেই তিনি মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করতেন, “আসে নাই… তাই না? আমি শুধু মাথা নাড়তাম। তারপর দেখতাম, তিনি চুপচাপ ঘরের ভেতরে চলে যেতেন। একটু পরেই উঠানের এক কোণে বসে আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি, অপেক্ষারও কান্না আছে। শুধু সেই কান্নার কোনো শব্দ হয় না।
বছরে একবার যখন পোস্ট অফিস থেকে খবর আসত ইংল্যান্ড লেটার এসেছে।” সেদিন মনজিলা চাচির মুখে এমন হাসি ফুটত, যেন ঈদ এসে গেছে। পরদিন ভোরে তিনি গোসল করে নতুন শাড়ি পরে তৈরি হয়ে বসে থাকতেন। একটু পর পর তিনি আমাকে এসে ডাক দিতেন, “আব্বা উটো, দেরি হচ্ছে। চলো, যাই- কিন্ত আমার স্কুল সময় এখনো অনেক বাকি, তাও তিনি অস্থির হয়ে বলতেন, “না আব্বা… চল। তারপর ১:৩০ মিনিট হেঁটে । হাটার সময় তিনি হাঁটতেন আর আমি তার পিছনে দৌড়ে গিয়েও পারতাম না, চিঠিটা হাতে পেয়ে তিনি বুকে চেপে ধরতেন। বারবার পড়তেন। একই চিঠি হয়তো শতবার পড়েছেন। কি লিখেছে জানতে চাইলেই বলতেন তোমার চাচা”আগামী বছর দেশে আসবে বলেছে।” এই একটি বাক্য নিয়েই তিনি আরেকটি বছর পার করে দিতেন।
এভাবেই এক বছর থেকে পাঁচ বছর, পাঁচ বছর থেকে দশ বছর, তারপর বিশ, ত্রিশ……. প্রতি চিঠিতেই লিখা একই কথা “আগামী বছর আসব।” কিন্তু সেই আগামী বছর আর কোনোদিন এল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিঠির যুগ শেষ হয়ে গেল। শহরে মাসে একবার টেলিফোনে কথা হতো। পরে আমাদের বাজারে একটি গ্রামীণ ফোন এলো। প্রতি শুক্রবার মনজিলা চাচি সকাল থেকেই বাজারে গিয়ে বসে থাকতেন। কখন বিদেশ থেকে ফোন আসবে। মাত্র পাঁচ কিংবা দশ মিনিটের কথোপকথন। তারপর আবার এক সপ্তাহ… এক মাস… আরেকটি অপেক্ষা।
এরপর মোবাইল ফোনের যুগ এলো। ঘরে ঘরে মোবাইল পৌঁছে গেল। ভিডিও কলের পৃথিবী চলে এলো। কিন্তু মজিদচাচা আর দেশে ফিরল না। এদিকে আমিও বড় হয়ে গেলাম। স্কুল শেষ করলাম। কলেজ শেষ করলাম। জীবনের ব্যস্ততা বাড়তে লাগল। একদিন আমিও উচ্চশিক্ষার জন্য রাশিয়ায় চলে এলাম। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল একদিন মজিদ চাচাও হয়তো এভাবেই দেশ ছেড়েছিলেন। সেদিন হয়তো তিনিও ভেবেছিলেন, দুই-তিন বছরের মধ্যেই ফিরে আসবেন। কিন্তু জীবন সব হিসাব মেনে চলে না। রাশিয়ায় পড়াশোনার সময় প্রায়ই মজিদ চাচার কথা মনে হতো। ভাবতাম, এই বিশাল দেশের কোথাও না কোথাও হয়তো তিনি আছেন।
২০২৪ সালে অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে তাকে খুঁজে পেলাম। দেখে বুকটা কেঁপে উঠেছিল। একদিনের সেই সুদর্শন, শক্ত-সমর্থ যুবক আজ ভীষণ অসুস্থ। শরীর ভেঙে গেছে। চোখের আলো নিভে এসেছে। বয়স তাকে যতটা বুড়ো করেনি, তার চেয়ে বেশি বুড়ো করেছে প্রবাসের কষ্ট। জীবনের সব যৌবন তিনি রেখে এসেছেন বিদেশের মাটিতে। অথচ বিনিময়ে কিছুই পাননি। না অর্থ, না সুখ, না পরিবারের উষ্ণতা। ওদিকে মনজিলা চাচিও বৃদ্ধা। একসময়ের সেই সুন্দর মুখে এখন সময়ের গভীর রেখা। তাদের কোনো সন্তান নেই। বার্ধক্যে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়ার মতোও কেউ নেই। কিছুদিন আগে খবর পেলাম মজিদ চাচা আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর শরীরে পচন ধরেছিল। নিঃশব্দে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। আর মনজিলা চাচি? তিনি এখনও বেঁচে আছেন। অসুস্থ। একলা।
হয়তো আজও মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হয়তো আজও মনে মনে ভাবেন আজ যদি আবার একটা ইংল্যান্ড লেটার আসত…” কিন্তু এখন আর পোস্টম্যান আসে না। পোস্ট অফিসের সেই কাঠের টেবিলও নেই। সেই সাদা খামও নেই। শুধু রয়ে গেছে এক নারীর সারাজীবনের অপেক্ষা, আর একজন প্রবাসীর অপূর্ণ ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। প্রবাসে টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। কিন্তু প্রবাসে হারিয়ে যাওয়া যৌবন, হারিয়ে যাওয়া সময় আর অপেক্ষায় শুকিয়ে যাওয়া দুটি জীবন সেগুলো কোনোদিন ফিরে আসে না। হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রেমপত্রের নাম ছিলো “ইংল্যান্ড লেটার”। আর সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার নাম—মনজিলা।



No comments