বিদ্যুৎ ও বিএনপি একই সুতোয় বাঁধা দুই অন্ধকার
দেশে গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। নিত্যদিনের নানা সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। রান্নার গ্যাসের সংকট, বিদ্যুতের ভোগান্তি, বাড়তি খরচ সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ ও হতাশা। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতি মানুষ আর কতদিন সহ্য করবে?
জনগণ কোনো সরকারের কাছে অলৌকিক কিছু প্রত্যাশা করে না। তারা চায় স্বাভাবিক জীবনযাপন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় গ্যাস এবং নিত্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি। কিন্তু প্রতিদিন যদি নাগরিকদের একই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থায়ও তার প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক।
বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগ, দায় কেন সাধারণ মানুষের?
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও রিকশাভ্যান চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও কোথাও অবৈধ সংযোগ এবং বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের নজরদারি কোথায়? কারা অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে, কারা এসব সংযোগ ব্যবহার করছে এবং কারা এর সুযোগ করে দিচ্ছে এসবের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ চুরি হয়ে থাকলে তার খেসারত শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। সিস্টেম লস, অবৈধ সংযোগ কিংবা চুরি যে নামেই বলা হোক না কেন, এর অর্থনৈতিক বোঝা কোনো না কোনোভাবে বৈধ গ্রাহকের ওপর এসে পড়ে। তাই বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
দায় চাপানোর রাজনীতি কতটা গ্রহণ করবে মানুষ?
বর্তমান সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করার রাজনৈতিক প্রবণতা থাকতেই পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে পড়তে পারে এটিও বাস্তবতা।
একটি সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন অতীতের সরকারের ব্যর্থতার হিসাব জনগণকে শোনানোর পাশাপাশি বর্তমান সংকট মোকাবিলার দায়িত্বও সেই সরকারেরই। মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে সমাধান দেখতে চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট কমবে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে।
মানুষ কতটা সহ্য করবে?
রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের মন বুঝতে পারা। মানুষের ক্ষোভ সবসময় মিছিল, স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় মানুষ নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু সেই নীরবতা যদি দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও ক্ষোভে পরিণত হয়, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। অতীতের সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর এ বিষয়টি মনে রাখা উচিত।
কোনো সরকারই ধরে নিতে পারে না যে মানুষ সবকিছু অনির্দিষ্টকাল সহ্য করবে। ক্ষমতায় থাকার জন্য শুধু রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, জনগণের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাও বুঝতে হয়।
বিএনপি যদি আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ধরে রাখতে চায়, তাহলে এখনই জনগণের পালস বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কোথায় বিদ্যুৎ সংকট বেশি, কেন গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, কোথায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ চলছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও বিএনপি যেন এক মায়ের পেটের দুই ভাই একটির সংকট অন্যটির ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। তাই সময় থাকতে এই সংকটের লাগাম টেনে ধরা বিএনপির জন্য শুধু জনগণের স্বস্তির বিষয় নয়, নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও জরুরি।


No comments