Header Ads

* অল্প কিছু কথা *

* অল্প কিছু কথা *
-------------------তাহমিনা নাহার।
১১-১২-২০১৭
----------------------
একাত্তুরের যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি সৈন্যদের তাদের দেশ ফিরিয়ে নেয়নি, এসব কথা আমি জানতামনা। যুদ্ধের সময়ের কোনকথা প্রায় মনে নেই বললেই চলে। যেটুকু মনে আছে তাতে ভয়ের কিছু নেই, ভয়াবহতা কাকে বলে সেটুকু বুঝিনি। শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়া কেন হচ্ছে, এগুলো বুঝিনি। বরং আনন্দ লাগতো বেড়াতে যাচ্ছি বলে। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখতাম আমি আমার বাবার কোলে। কোথায় যাচ্ছে সবাই দল বেঁধে পায়ে হেঁটে জানিনা, একপলক তাকিয়ে দেখে কোলেই ঘুমিয়ে যেতাম। এগুলোও কি আমার মনের ভ্রান্তি কিনা জানিনা, তবে ভ্রান্তি মনে হয়না, কারণ আমার স্মৃতি শক্তি মাশাআল্লাহ ছোটকাল থেকেই বেশ, আজো ভালো। এটা আমি নিজে বুঝি, আমার আত্মীয় স্বজনরাও আমার স্মৃতি শক্তির প্রশংসা করে। তো মনে আছে, আমাদের বাড়ীতে উঠানে একটা বিরাট গর্ত করা হয়েছিলো, সে গর্তটা করার সময় আমি এবং আমার সমবয়সী চাচাতো ভাইবোনেরা খুব খুশী ছিলাম, এইভেবে যে একটা কিছু নতুন হচ্ছে। বিরাট গর্তের উপড়ে টিনের চালা দেয়া হয়েছিলো, ভেতরে ঘরের মতো। সবাই এটার ভেতর একসাথে থাকবো ভেবে খুব খুশী ছিলাম। মাঝে মাঝে যখন আওয়াজ করে হেলিকপ্টারগুলো বাড়ীর উপড় দিয়ে যেতো তখন খুশীতে চিৎকার করতাম "বিমান যায়, বিমান যায়" বলে। বড়রা তখন আমাদের টেনে হিঁচড়ে লুকিয়ে ফেলতো, কিন্তু কেন এগুলো  বুঝতামনা। বিমান দেখছি তো বড়রা কেন এমন ভেতরে টেনে নিয়ে যায় সেটা আরো একটু বড় হয়ে বুঝেছি। গর্ত কেন করা হয়েছিলো সেটাও পরে বুঝেছি, এইজন্য যে গুলির শব্দ যেন কানে সমস্যা না করে, এমনই একটা কিছু হয়তো হবে। গর্তটা যখন করছিলো আমার বাবা,চাচারা সেই সময়টায় আমার নিজের উচ্ছাসটার কথা মনে আছে, এরপর এটার ভেতর কিভাবে ঘুমিয়েছি, কোথায় খেয়েছি এগুলো কিচ্ছু মনে করতে পারছিনা।
যা দিয়ে লেখা শুরু করেছি তা বাদ দিয়ে কোথায় চলে গেলাম! যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি  সৈন্যদের কথা বলছিলাম--।
আমার হাসব্যান্ডের সেলাইকাজের ব্যবসা ছিলো। সেই সুবাদে বাঙ্গালী, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি আমাদের এখানে কাজ করতো।  একবার এক পাকিস্তানি কাজে এসেছিলো, তবে সে পাকিস্তান  থেকে আসেনি, এসেছে সৌদি থেকে। সে নাকি অনেক বছর তার দেশে যায়না। সময়টা যা বললো তা একাত্তরই হবে।  তবে সনটা সে বলেনা। মাঝে মাঝে আমাকে জিজ্ঞেস  করে,
" ভাবী, তোমার বাড়ী কি ঢাকায়?
" না, ময়মনসিংহে।
" এটা কোথায়? চিটাগাংয়ে?
" নাহ্, ওটা অন্যদিকে।

সে কেন আমাকে এগুলো জিজ্ঞেস  করে আমি বুঝিনা। একদিন আমার হাসব্যান্ডকে বলছি, "লোকটা কেন এগুলো জানতে চায়,  ও
শুধু এ'দুটো জায়গার নাম জানে কিভাবে? "বুঝোনা? সে সৌদি থেকে এসেছে, সে একজন যুদ্ধপরাজিত সৈনিক।
" তো কি হয়েছে? সেজন্য সৌদীর সাথে কি সম্পর্ক?
"পরাজিত সৈনিকদের তাদের দেশ কখনো ফিরিয়ে নেয়না। বাংলাদেশের সাথে যখন হেরে গিয়েছিলো তখন পাকিস্তান  তাদের গ্রহণ করেনি,  সৌদি তাদের আশ্রয় দিয়েছিলো। আর ঢাকা, চিটাগং ছাড়া কিছু চেনেনা কারণ, দুটো জায়গাতেই বড় সেক্টর ছিলো।
" আচ্ছা, আমি তাহলে ওকে আজ ধরবো,  সত্যটা বের করবো।
পরেরদিন কাজের জায়গায় গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস  করেছি,
" রাজাজ্বী, বাত কেয়াহে? সাচ বাতাও।
" কেয়া ভাবিজ্বী?
" আপ স্রেফ ঢাকা অর চিটাগং  জানতেহো, অর কুচ নেহী। কিঁউ? সৌদিমে কিঁউ তুম ইতনা সালতক? ইতনা টাইম কিঁউ নেহি গেয়া পাকিস্তান? 
" এসাই,  বাত কুচ নেহী।
" কুচ নেহী? সাচ বাতাও কিৎনা বাংলাদেশী মারা তুমনে।
" নেহী, নেহী ভাবী এছা কুচ নেহী।
" তো কেছা, বাতাও।
আর কোন জবাব সে দেয়নি। এই ব্যপারে কোনদিন আর কোন কথা তুলেনি। আমি তাকে মিথ্যে অপবাদ  দিয়েছি সেকথাও বলেনি। এ' জন্যই বুঝে গিয়েছিলাম সে একজন পাকিস্তানি  হানাদার, বর্বর।  এখানে এসেও কাগজ ছিলোনা, কিভাবে জানি সৌদি থেকে দালালের মাধ্যমে এসেছিলো। কাগজ করে দেয়ার জন্য খুব চাপাচাপি করছিলো। আমাদের ভাতিজার কাগজ করে দেয়ার সময় খুব ঘ্যানর ঘ্যানর করছিলো,
" ভাবীজ্বী,  বলোনা ভাইয়াসে মেরে কাগজাকা বারেমে! মেতো ইধারহুঁ, ভাতিজাতো মুল্লুকমে।
" তো কেয়া হুয়া? ওতো আপনা ভাতিজা উনকা।
" মে বি ভাই হুঁনা উনকা?
" নেহী, তুম পাকিস্তানি,  হামারা ভাই নেহী হো সাকতা।
তারপর,  রাগ করে চলে গেছিলো।
এখনো আছে আমাদের এলাকায়, মাঝে মাঝে দেখা হয়। তিরিশ বছর পর দেশে গিয়েছিলো।
বউ,  ছেলে, মেয়ে নিয়ে এসেছে, হজ্জ করে এসেছে। বয়স প্রায় ৬৫/৭০ হয়েছে।

অনেক দেরীতে হলেও দেখেছিলাম হানাদার, মানুষের মতোই দেখতে, তবে অমানুষ।।

No comments

Powered by Blogger.