Header Ads

ঘুরে এলাম ইবনে বতুতার দেশ মরক্কো

(৪র্থ পর্ব)

একান্ত অনুগত অনুসারী হয়ে আমরা ইকবাল ভাইর পেছন পেছন উপরে উঠে তৃতীয় তলায় পৌছালাম, লিফট ছাড়া স্পেনে কেউই সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠার প্র্যাকটিস  না থাকায় কেউ কেউ জোরে জোরে ফোঁস ফাঁস নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন, আলম ভাই একটু বেড়ে মা বাবাকে স্মরন করছিলেন, আর সায়েম ভাই স্বভাব সুলভ ভঙ্গিমায় হৈচৈ রবে মরোক্কীদের রুচির দূর্ণাম করছিলেন, আকস্মিক সব হৈচৈ থেমে গেল, কঁকানো গোঙানো বন্ধ হয়ে গেল, মিষ্টি কন্ঠে ভেসে এলো আসসালামুআলাইকুম,,,
আহলান,,,আহলান,, আমাদের টিমের কেউ কেউ ওয়ালাইকুম সালাম বলতে ভুলে গেলেন, তাকিয়ে রইলেন আসমানের দিকে, কারন তাঁরা দিনে দুপুরে চাঁদের সাক্ষাত পেয়েছিলেন, দরজায় দাঁড়িয়ে ইকবাল ভাইয়ের আধুনিক, স্মার্ট মেডিকেল পড়ুয়া সুদর্শন শ্যালিকা আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন, তাই মুহুর্তের এই নীরবতা, কাব্যকাননের ভাবুক কবিদের প্রেতাত্মারা সকলের কাঁধে একএক করে সওয়ার হয়েছে, আটলান্টিক বিধৌত লু হাওয়ায় ভেসে আসছে, তুমি কোন কাননের ফুলগো, কোন গগনের তারা।

নীরবতা ভেঙে জহিরভাই প্রশ্ন করলেন মাশাল্লা এটাকি ইকবালভাইর আপনালয় না শ্বশুরালয়? আবুবকর ভাই তাকে থামিয়ে দিলেন। আমরা একটি বড় হলরুমের মতো কামরায় প্রবেশ করলাম,  এটি ইন্টেরিয়র বৈঠক খানা, কম করে হলেও এখানে ৫০ জন আওলাদে আদম একসাথে বসতে পারবে। এই কামরার চারদিকের দেয়াললাগোয়া এটাচড সোফা, যা অনেকটা জলসা ঘরের আদলে তৈরী, মাঝখানটায় প্রায় চার ইঞ্চিপুরু দামী কার্পেট। এটা মরক্কোর একটি আদিম ঐতিহ্য, বিশাল বসার ঘর, প্রায় প্রতিটি সমর্থবান বাড়ীতেই এ জাতীয় বৈঠক খানা কাম জলসাঘর স্হাপন করা আছে। আমি এ মাথা ও মাথাজুড়ে বিস্তৃত বিশাল বৈঠকখানার লম্বা সোফায় সটান শুয়ে পড়লাম, জহির ভাই আমাকে বকবকি করতে করতে নিজেও তাই করলেন, শাহ আলমভাই জহির ভাইর প্রতি মিষ্টি তিরষ্কারের বাণ ছুঁড়লেন।

আমাদের কান্ড দেখে আলম ভাই হেসে দিলেন, আর উপযুক্ত সময়ে যুক্তিযুক্ত পরামর্শ দিলেন শফি ভাই, বললেন আল্লার নাম নিয়া চোখ বন্ধ করেন, খাওয়া শেষে আমি ডাইকা দিমুনে। ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে দু'জনেই উঠে বাথরুমের সিরিয়াল দিলাম, তিন তিনটি বাথরুমে সকলে ঝটপট শৌচকর্ম শেষে ওযু করে নিলাম,  একসাথে জোহর ও আসর নামাজ পড়া হলো জামাত সহকারে। আহ কি মজা! অর্ধেক নামাজ তাও আবার দুই ওয়াক্ত একসাথে, কারন আমরা মুসাফির। ফাঁকিবাজ নামাজীদের জন্য এটা এক আনন্দের খবর। আনন্দের খবর ক্লান্ত, শ্রান্ত সফর পরিকল্পনায় উৎকন্ঠিত মুসাফিরদের জন্য।

নামাজের জামাত কার কতটুকু হয়েছে জানিনা, আমি কিন্তু নামাজে মনসংযোগ করতে পারিনাই। কারন ছিল ভেতরের খাবার ঘর থেকে বাতাসে ভেসে আসা মাওইমা আর বেয়াইন
 সৃষ্ট মিষ্টি মৌ মৌ ঘ্রাণ! আহা সেকি সুবাস! আজ আাস্বাদন হবে আনন্দ হবে, হবে মাওইর হাতের রান্নাভোজ। আজ পান হবে,  পানপাত্রে সুপেয় ঠান্ডাজল, সুনয়না বেয়াইন হবেন জল সাকী।
আমাদের জন্য মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী খাবার " কুচকুচ রান্না হচ্ছে" এটা তারই সুবাস। এ সুবাসে আমি কেন? দশপ্রহরার ধ্যান মগ্ন  যোগিনীর ধ্যানও ভঙ্গ হতে বাধ্য! পেটের ভেতর কমলার রসের আবরনে আবৃত গুমোট ক্ষুধার অসুর পুনরায় হুংকার ছেড়ে জেগে উঠেছে, আর রক্ষা নেই, রক্ষা নেই কুচকুচের। কিন্তু একি ইকবাল ভাইর কয়ারীতে বেয়াইন আরবীতে জানালেন আরো ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। বিধি তুমিই একটা বিহিত কর বিধি। পরিস্হিতি অনুমানে আলআমিন ভাই আবারো ত্রাণকর্তারুপে এগিয়ে এলেন, হয়ে গেল আরেকদফা কমলা পান। পরক্ষনেই ইকবালভাই জুস আর ফলফলাদি নিয়ে এসে পড়লেন, আমি সতর্কতার সাথে কম খেলাম, খাবোতো কুচকুচ, আাহা কুচ কুচ! কতস্বাদ জানি তব তায়,,,!

"কুচ কুচ" একধরনের আরবী খাবার, যা কাউন চালের ভাতের মতো, আর এর সাথে মরিচছাড়া মসলার ঝাল সমৃদ্ধ সব্জি সহকারে গরু বা ছাগলের মোমসিদ্ধ রান্নাকরা মাংস। একবার যদি কেউ মরক্কোর তাঞ্জিয়ারের কুচকুচ খেয়েছে তো  শ্বশুরবাড়ীর আস্তানা এখানে গাড়ার ফন্দি তার মাথায় জগদ্দলের মতো চেপে বসেছে। রিয়েলি এক অনন্যস্বাদের স্বাস্হ্যকর খাবার কুচকুচ।

অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমরা ঢুকে গেলাম রান্নাঘর কাম ডাইনিংরুমে। দুই দুইটি বিশাল ডাইনিং টেবিলে দুইগ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিশাল দুইটি প্লেটকে মাঝখানে নিয়ে আল্লা রসুলের নাম নিয়ে ভোজন অভিযানে বসে পড়লাম আমরা ১১ খাদক যোদ্ধা! একটি বিরাটপ্লেটে চারপাঁচজন একসাথে খানাখাওয়া এটাও মরক্কোর মেহমানদারীর ঐতিহ্য, মাওই মা ইতোমধ্যে আমরা যারা পায়ের মোজা খুলে ঠান্ডা ফ্লোরে পা গুটিয়ে পায়ের পাতার সাথে পাতা লাগিয়ে বসেছিলাম তাদেরকে অবাক করে দিয়ে পায়ের কাছে স্যান্ডেল এনে স্যান্ডেল পরিয়ে দিলেন, আমরা আরে আরে, করেকি করেকি বলতে বলতে জুতা পরে আরামে বসলাম। কুচকুচের সাথে আমাদের প্লেটে দেওয়া মাংস গুলো ছিল একেবারে গালানো মোমের মতো নরম, আর স্বাদ!এই খাবারের স্বাদ অনেকদিন রসনা দেবের স্মরনে থাকবে। আমরাএক নিমিষে সমস্ত কুচকুচ সাবাড় করে ফেললাম।



No comments

Powered by Blogger.