* অসুন্দরের মাঝে সুন্দর *
-----------------তাহমিনা নাহার--------------------।
২২-১১-২০১৭
-----------------------
* রুহী জন্মেছে এক অভাবের সংসারে, পাঁচটা ভাইবোন সহ সাত জনের সংসার। বাবা তার কামলা খাটে, মার কোল অবসর দেখেনি যখন থেকে বুঝতে শিখেছে। সেই আট বছর বয়স থেকে রুহী তার ভাইবোন কোলে নেয়, মা যখন পাড়ায় অন্যের বাড়ীতে কাজ করতে যায়। শিশু বয়সের দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা রুহীর জন্য ছিলোনা। সকালবেলাটা কোনদিন কিছু খেয়ে, কোনদিন না খেয়েই প্রাইমারী স্কুলে যেতো। এসেই ভাইবোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। অমত করার জো নেই, মায়ের হাতের চড় থাপ্পরের ভয়ে ভালো না লাগলেও জোর করে ভালো লাগাতে হতো। রুহী মাকে খুব ভালোবাসতো, মা তাকে মারলেও রাতে রুহী মাঝে মাঝে টের পেতো মা তাকে আদর করছে, কপালে চুমু দিচ্ছে। এর কারণ সেদিন এতোটা না বুঝলেও আজ বুঝে, মার নিশ্চয়ই কষ্ট হতো রুহীর শৈশব চুরি করেছিলো বলে, এ' ছাড়া উপায়ইবা কি ছিলো আর তার মায়ের!
-- রুহী যখন সবে বালিকা থেকে নারীত্বে পা রেখেছে তখনই রুহীর বাবা তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য ব্যস্ত হলো, মা এতোটা সায় না দিলেও অভাবের কাছে হার মেনেছিলো। মা বলছিলো,
" আর দুইটা বছর যাইতে দেন, আর একটু বড় হওক।
" হইবোনে বড় স্বামীর ঘরে, বিদায় করতে পারলেই বাঁচি, সংসারের খাওনের একটা মুখ কম অইবো।
--অভাবের সংসারে বড় হতে থাকলেও মেয়েটা প্রকৃতির নিয়মে দিনে দিনে খুব সুন্দর হয়ে ওঠছে, সুন্দরী মেয়ে গরীব বাবার ঘরে নিরাপদও নয়।
--এরপরও চলে গেলো আরো একবছর। ১৪ তে পা দেবার সাথে সাথে রুহীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো ৩৪ বছরের এক রোগা পটকার সাথে। ঘাটের মরা হলে কি হবে, রুহীতো দুটো ভাত খেতে পারবে, দুটো কাপড় পাবে!
-- অভাব কি জিনিস, সেটা রুহী বুঝেছিলো, স্বামী কি জিনিস, ভালোবাসা কাকে বলে এগুলো না বুঝেও মনুর সাথে থাকতে লাগলো।
--রুহীর স্বামী মনুর কি অসুখ সে নিজেও জানেনা, বড় কোন ডাক্তারের কাছে কখনো যায়নি, কবিরাজি আর হোমিওপ্যাথি দিয়েই চলে। আর্থিক অবস্থা খুববেশী ভালো না হলেও একেবারে খারাপ নয়। কিন্তু রোগবালাইয়ের জন্য কিছুই করতে পারেনা, বসে খেলে রাজার ভান্ডারও শেষ হয়। রুহীর শ্বশুড়, শ্বাশুড়ী কেউ ছিলোনা, ননদ দেবর কেউ নেই, এসবদিক দিক দিয়ে রুহী ঝামেলামুক্ত। থাকার মধ্যে আছে মনুর এক সৎ চাচা, যার বয়স মনুর থেকে খুব বেশী নয়, মাত্র ছয় বছরের বড়। আবার বছর ঘুরলে রুহীর ঘরে একটি কন্যাশিশুও আসে। দিনে দিনে মনুর অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। কন্যা শিশুর জন্মের পর মনু একদিন বলে,
" মাইয়াডা অইলো, একটা পোলা অইলে না ভালো অইতো, আমারও শরীলডা ভালানা, কিছু যদি অয় তুই খালি মাইয়াডা নিয়া কেমনে থাকবি!
" দেহা যাইবোনে কেমনে থাকি, পোলা অয় নাই কি করোন যাইবো?
" আর একটা সন্তান নে, একটা পোলা যদি অয়!
-- বলতে গেলে মনুর প্রবল ইচ্ছাতেই রুহী আবার মা হলো, আবার মেয়ে। সেই কষ্টে রোগা মনুমিয়া যেন আরো রোগা হয়ে গেলো। শেষের বছরটা প্রায় জমিজমা বিক্রি করে মনুর চিকিৎসার খরচ চালিয়েছে রুহী। এরপরও মনু বাঁচেনি। ১৮ বছরের ভরা যৌবনা রুহীকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে মনু চলে গেলো পরপারে।
-- ছোট দুটো মেয়ে নিয়ে রুহীর দিন যায় কোন মতো, খেয়ে না খেয়ে।
স্বামীকে যে খুব ভালোবাসতো তা ও নয়, তবু চেয়েছিলো সে বাঁচুক। ১৮ বছরের শরীরটা নিয়ে কিযে ভোগান্তী হবে সেটা রুহী টের পায়, মনু বেঁচে থাকতে কেউ এসে খোঁজ নিতোনা, এখন প্রতিবেশী কতজন আসে খোঁজ নিতে, এমনকি যে চাচা শ্বশুড় কখনো খোঁজ নেয়নি অসুস্থ্য ভাতিজার, তারও রুহীর প্রতি আলগা দরদ জমেছে। রুহী সব টের পায়, ভয়ে ভয়ে থাকে, সন্ধ্যে হলে মেয়ে দুটোকে বুকে জড়িয়ে নিঃশব্দে, ঘুমে নির্ঘুমে রাতটুকু কাটায়। মাঝে মাঝে শুনতে পায় তার বেড়ার ঘরের পেছনে কারো পায়ের শব্দ। সেই থেকে রাত হলে হাতের কাছে বটি দা নিয়ে শোয়।
--কখনো কিছু প্রয়োজন হলে রাস্তার মোড়ে একটা দোকান থেকে নিজেই গিয়ে নিয়ে আসে। কখনো নগদ, কখনো বাকীতে। বাকীর পয়সা দিতে দেরী হলে দোকানদার আগে রাগ করতো, এখন আর করেনা, রুহীর ভরা শরীরটার দিকে তাকিয়ে খুশীতে জিনিস দিয়ে দেয়। আরো কিছু লাগবে কিনা যেচে জিজ্ঞেস করে। অভাব, সহানুভুতি, সবমিলিয়ে দোকানদারের প্রতি রুহীর যেন কেমন একটা অনুভুতি জন্ম নেয়। রুহী ভাবে,
" এটাই কি ভালোবাসা? মনুর প্রতিতো এমনটা ছিলোনা।
--ধীরে ধীরে দোকানদারের ডাকে, নিজের শরীরের তাগিদে রুহী সাড়া দেয়।
একদিন সন্ধ্যেবেলায় রুহী আর দোকানদারকে গ্রামের কয়েকজন হাতে নাতে ধরে ফেলেছে, এমন অবস্থায় অস্বীকার করার কোন ব্যবস্থা রইলোনা।
বিচার, সালিশ হলো, যার যা মুখে এলো তাই বলে রুহীকে গালমন্দ করছে। চাচা শ্বশুড় যা পারে তাই বলে গালিগালাজ করেছে।
সেই থেকে রুহী আরো বেশী ভয়ে সিটিয়ে থাকে। এরপরও দোকানদারের প্রতি বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে, তাকে দেখতে ইচ্ছে করে। রাত বাড়ে, রুহী এসবই ভাবছে। কখন ঘুমিয়ে গেলো টের পায়নি। হঠাৎ শুনতে পেলো কেউ যেন খুব সন্তর্পণে তার ঘরের ঝাঁপ খুলে ভেতরে ঢুকছে। রুহী অন্ধকারে হাতরিয়ে দাটা হাতে নিয়ে তৈরী হলো। আগন্তক ক্ষীণ লাইটের আলো দিয়ে কি যেন খুঁজছে, আলোটা এতো ক্ষীণ যে রুহী কিছু দেখতে পাচ্ছেনা। রুহী হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দেয়ার আগেই কেউ তাকে জড়িয়ে ধরেছে, রুহী নিজেকে বাঁচাতে হাতের দা দিয়ে একটা কোপ দিয়ে দিয়েছে, কোথায় দিলো বুঝতে পারেনি। কোপের আঘাতে ককিয়ে ওঠার আওয়াজে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে ওঠে দাঁড়ালো রুহী, এযে তার চাচা শ্বশুড়! রুহী হারিকেনের আলো বাড়িয়ে মুখের সামনে ধরলো। চাচা শ্বশুড় দৌড়ে বের হতে চেয়েও পারেনি, রুহী দা টা নিয়ে ঝাঁপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রাগে, লজ্জায়, থরথর করে কাঁপছে। কোথা থেকে শক্তি পেলো মেয়েটা এতো জোরে চিৎকার করতে! যার আওয়াজে মধ্যরাতে বেশকিছু প্রতিবেশী এসে জড়ো হয়েছে। এককথাই কয়েকবার উচ্চারণ করছে,
" শুয়োরের বাচ্চা, তুই না আমার চাচা শ্বশুড়! কেমনে তুই এটা করতে পারলি?
দোকানদারের সাথে আমাকে পেয়ে বিচারতো ভালো করছোস, তোর বাড়ীর ইজ্জত আমি নষ্ট করছি বলছোস, তুই কি করলি? রাইতের আন্ধারে সম্পর্ক থাকেনা? জবাব দে শুয়োরের বাচ্চা।
রুহীর একতরফা চেঁচামেচি শুনে কয়েকজন ঝাঁপ ঠেলে ভেতরে গেলো। চাচার পিঠে কোপটা লেগেছে, রক্ত ঝরছে।
-- কেউ একজন দয়া করে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেছে রুহীর দুইটা মেয়েসহ রুহীর দায়িত্বটা নেবে কিনা! দোকানদার রাজী হলো। এটাই বুঝি ভালোবাসা!
-- মনুমিয়ার বাড়ী থেকে ভিটের মাটিটুকু বিক্রি করে রুহী সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে চলে গিয়েছে দোকানদারের সাথে।।

No comments