Header Ads

ঘুরে এলাম ইবনে বতুতার দেশ মরক্কো

(পর্ব---০৩)
মাদ্রিদের বারাখাস বিমানবন্দর থেকে মরক্কোর তাঞ্জিয়ার এর উদ্দেশ্য আমাদের বিমান উড্ডয়ন শুরু করলো সকাল ১১:০০টায়, চমৎকার রৌদ্রজ্বল ঝলমলে সোনালী রোদ মাখা ওয়েদার আমাদের যাত্রার সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তুলছিল।
আমাদের সহযাত্রী ব্যবসায়ী ইকবাল ভাই মিতভাষী ও বন্ধুবৎসল মানুষ। আজকের সফরে তাঁর প্রাণবন্ত হাসি ও মজার মজার কমেন্টস আর সকলের মতো আমিও উপভোগ করছিলাম, তাঞ্জিয়ারে তাঁর কেনা বাড়িতেই আমরা উঠবো, ফ্রেশ হবো ও দুপুরের খাবার খাবো, তাঁর শ্বাশুড়ি মা ও শ্যালিকা মিলে ইতোমধ্যেই অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছেন, তাঞ্জিয়ারে তাঁর আরো একটি বাড়ি ও রয়েছে যা প্রায় দুইলক্ষ ইউরো দিয়ে কেনা। আলআমিন ভাই বাঙালী চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী তালই বাড়ী যাচ্ছেন ভেবে নানান ফলফলাদিতে ঠাসা আধমন ওজনের এক গাঁটুরি নিয়েই বিমানে উঠেছেন। যদিও স্পেন বা মরক্কোর সংস্কৃতিতে এই বিষয়গুলো একেবারেই গৌন তবুও বাঙালি তার চিরায়ত কিছু বৈশিষ্ট্যর কারনে পৃথিবীর যে কোন জাতি অপেক্ষা এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠত থাকবে চিরকাল। আমি অবাক হয়েছি এটা দেখে এই আলআমিন ভাই কোটি টাকার মালিক হয়েও স্রেফ বন্ধুর সম্মানে অত্যন্ত সাধারনের মতো একটা ফলের গাঁটুরি টেনে নিয়ে এসেছেন, এটা নিঃসন্দেহে একজন সাদা মনের মানুষের পরিচয় বহনকারী। আমার বার বার মনে পড়ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর রসগোল্লা গল্পের ঝান্ডুদার কথা, মনে ভাবছিলাম ঝান্ডুদা'রা এভাবেই আমাদের লোকায়ত সমাজে এমনিভাবেই বেঁচে থাকবে কালান্তরে!
স্পেনের আান্দালুসিয়া ভুক্ত ভুখন্ডের উপর দিয়ে উড়ে চলল আমাদের বিমান, নীচে নগরী, টিলা, জয়তুন বাগান, আবাদী ভুমি ও সবশেষে সাগর অতিক্রম করে ১ঘন্টা ২০ মিনিট উড্ডয়নের পর তান্ঞ্জিয়ার বিমান বন্দরে আমাদের বিমান অবতরন করলো। বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চলে আসলাম পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট স্টেশনে, ইকবাল ভাইর তৎপরতায় গাড়ী ঠিক করতে কোন বেগ পেতে হলোনা। মরক্কোর জনসাধারন আরবীর পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ বলতে অভ্যস্ত, কেননা ফ্রেঞ্চ তাদের সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ। স্প্যানিশ ও ইংলিশ কেউ কেউ বুঝলেও ৯৯ জনই তা বুঝেনা। সুতরাং আপাতত আমরা ভাষাহীন হয়ে গেলাম। ইকবাল ভাই আর আবুবকর ভাই ই আমাদের পাথফাইন্ডার ও গাইড। তবে বডি ল্যাংগুয়েজ সারা বিশ্বেই এক হওয়ায় গ্লোবাল এই ল্যাংগুয়েজের সাহায্য যে আমরা নেই নি তা কিন্তু নয়। আমাদের সংগী মোবাইল ব্যবসায়ী "হাফেজ" জহির ভাই মাঝে মাঝে দু একটা যুতসই মুখস্ত আয়াত দিয়ে কেল্লাফতের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন যত্র তত্র।
আল আমিন ভাই, সায়েমভাই,আমি - তাঁর সেই প্রচেষ্টায় হাওয়া দিয়ে অংশগ্রহনের করে ক্রেডিট নিতে ভুল করিনি।
পনেরোষোলো মিনিটের ড্রাইভিং ওয়ে পার হয়ে চলে এলাম ইকবালভাই এর তাঞ্জিয়ার বাস ভবনের গেটে, সায়েম ভাই হই হল্লা রবে তালই বাড়ী আসার আনন্দে বাংলায় উচ্চস্বরে কথা বলে এলাকার মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলেন।
ইকবাল ভাই সবাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে উপরে নিয়ে চললেন, আমরা এলাম, ইকবাল ভাইর বাসায় এলাম, এলাম তাঞ্জিয়ারে ইবনে বতুতার শহরে, ইবনে বতুতা একজন ধর্মতাত্মিক, পরিব্রাজক, বিচারক ও পন্ডিত ব্যক্তি, তিনি তাঁর সমসাময়িক কালে সমগ্র মুসলিমজাহান পরিভ্রমন করেন। পরবর্তীতে মরক্কো ফিরে এলে মরক্কোর সুলতান কর্তৃক নিয়োগকৃত সেক্রটারী তাঁর ভ্রমন অভিজ্ঞতা " রেহ্লা" নামক পুস্তকে লিপিবদ্ধ করেন। এটি ১৪শ শতকের পূর্ব, মধ্য, এবং দক্ষিন এশিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের এক অথেনটিক ঐতিহাসিক দলিল। এই মহান বাস্তবজ্ঞান তাপস এই তাঞ্জিয়ার শহরেই ইংরেজী ১৩০৪ সনের ২৪ শে ফেব্রুয়ারী একসম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। ২১ বছর বয়স থেকে শুরু করে ইবনেবতুতা পরবর্তী ৩০ বছরে ৭৫০০০ মাইল পথ পরিভ্রমন করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ৪০ টি দেশ সফর করেন, ও রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তি গনের সাক্ষাত লাভ করেন। ইবনেবতুতা একজন জ্ঞান তাপস হলেও পরিব্রাজক হিসেবেই সর্বাধিক খ্যাতিলাভ করেছিলেন। তাঁর কিছুকাল পুর্বে ভেনিসের পরিব্রাজক " মার্কোপোলো " ভ্রমন প্রাচুর্যে অভিষিক্ত হলেও ইবনে বতুতা তার চাইতে তিনগুন পথ পরিভ্রমন করে মার্কোপোলোকে পেছনে ফেলেন।
ইবনে বতুতা
ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সনের ৯-ই জুলাই দক্ষিণ ভারত হয়ে বাংলাদেশের চাটগাঁও অঞ্চলে পৌছান। বাংলায় তিনি দুই মাসেরও কম সময় অবস্হান করেন। চাটগাঁও থেকে তিনি ভারতের কামরুপ পার্বত্যাঞ্চল হয়ে নৌকাযোগে ১৫ দিনের পথ অতিক্রম করে সোনারগাঁও শহরে পৌঁছান। সোনারগাঁ তখন বাংলার রাজধানী। তখন বাংলার নরপতি বা সুলতান ছিলেন ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ।
"রেহ্লা" গ্রন্হে ইবনে বতুতা তৎকালীন সুবে বাংলার আবহাওয়া জলবায়ু, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ব্যবস্হার এক বিশদ বিবরন পেশ করেন। তা আজও বাংলার ইতিহাস অন্বেষী অনুসন্ধিতসু পাঠকের অনবদ্য জ্ঞানের খোরাক।
আশ্চর্য হলেও সত্য ইবনে বতুতার বর্ণনায় তৎকালীন বাংলায় দাস প্রথার সু-স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর সাক্ষ্যমতে তৎকালীন খোলাবাজারে দাস-দাসী বেচা কেনা হতো। বাজারে দ্রব্যমুল্যের তালিকা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন যে উপপত্নী হিসেবে ব্যবহারযোগ্য এক সুন্দরী তরুনী বাজারে তাঁর সামনে ০১ (এক) স্বর্ণ মুদ্রায় বিক্রি হয়েছে। তিনি নিজেও প্রায় অনুরুপমুল্যে "আশুরা" নামীয় এক যুবতী দাসী ক্রয় করেন। সে ছিল পরমা সুন্দরী। তাঁর এক সঙ্গী তখন লুলু" নামে এক সুদর্শন দাস বালককে দুই স্বর্ণ দীনারে ক্রয় করেন।
ইবনে বতুতা বাঙালা সফরের সময় দেশে নিত্য ব্যবহার্য পণ্য সামগ্রীর বাজার মুল্যের একটি তালিকা তাঁর বিবরনীতে দিয়েছেন। নীচের ছবির সাথে সেই তালিকার একটি কপি সংযুক্ত করা হলো
hossain iqbal
আল আমিন মিয়া, আব্দুল গফুর মিলন, মোঃ ইকবাল হোসেন
আমরা সুবে বাংলার অধুনা প্রবাসীরা স্পেন ছেড়ে মরক্কো এলেও কেন যেন মনে হচ্ছিল আমরা ঢাকার কোন একটি অভিজাত মহল্লায়ই উঠেছি, বিশ্বাস ও আদর্শে মুসলিম প্রধান দেশ হওয়াতেই হয়তোবা আমাদের এই অনুভূতি, তা ছাড়া এখানকার মানুষগুলো বাংলাদেশকে যেন আগে থেকেই চেনে, "তোমরা আমাদের ভাই" একথা বলেই তারা প্রাথমিক সাক্ষাতে আপন আবেশ তৈরী করে নেয়াতেও হয়তোবা আমাদের এই উপলব্দি। এখানকার অধিবাসীদের অনেককেই ভু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সচেতন বলে মনে হলো, তাদের কেউ কেউ মায়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ব্যপারে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করছিল, আর বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম হামদর্দির জন্য বাংলাদেশের শোকরগোজার করছিল,,,,,,

No comments

Powered by Blogger.