আনকাট স্টোরি অফ মজিদ চাচা
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মানুষ একা বাস করতে পারে না। সমাজে বাস করতে হলে প্রতিদিন কারো না কারো মুখাপেক্ষী হতে হয়। মানুষ একা থাকতে পারে না এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সে চায় কারো সাথে কথা বলতে, সুখ-দুঃখ ভাগ করতে, মনের ভেতরের কষ্টগুলো কাউকে বলতে, একটু ভালোবাসা পেতে, একটু আপন মানুষ পেতে।
বিশেষ করে প্রবাস জীবনে এই সত্যটা আরও বেশি বোঝা যায়। এখানে আত্মীয় থাকে না, ভাই থাকে না, শৈশবের বন্ধু থাকে না। তখন ছোট ছোট পরিচিত মানুষরাই একসময় আপন হয়ে যায়। দোকানদার, রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, পাশের বাসার লোক এরা ধীরে ধীরে জীবনের অংশ হয়ে যায়।
ঠিক তেমনই একজন মানুষ ছিলেন #মজিদ চাচা।
চাচার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো প্রায় ৭/৮ বছর আগে। একদিন আমি আর আমার এক বন্ধু ঢুকেছিলাম একটি ইরানি সুপার মার্কেটে। চাচা ছিলেন দোকানের মালিক। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন একজন ইরানি মহিলাকে। চাচা আর তার স্ত্রী দুজনই দোকানে বসতেন। আমরা প্রথম যেদিন দোকানে যাই, চাচা আমাদের দেখিয়ে মহিলাকে ফার্সিতে বললেন
“Nagoo ke man hamshahrishun hastam।”
মানে, মহিলা যেন না বলে যে তিনি আমাদের স্বদেশী।
আমি ফার্সিটা একটু বুঝতাম। বুঝে আমি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, “লোকটা কি দোকানের মালিক?”
মহিলা বললেন, “হ্যাঁ, কিন্তু কেন?”
আমি বললাম, আমরা এখানে ভিক্ষা করতে আসিনি। আমরা কাস্টমার, কিছু কেনাকাটা করে চলে যাবো।”
পরে চাচা বুঝতে পারলেন আমরা তার কথা বুঝেছি। তিনি নিজেই এসে আমাদের সাথে কথা বললেন। তিনি বললেন, তিনি বাংলাদেশীদের সাথে বেশি মিশেন না, বাংলাদেশে যাননা, বাংলাদেশ ভালো লাগে না দূরে থাকেন। তার অনেক অভিযোগ ছিল বাংলাদেশীরা নাকি সভ্য না, বিদেশে এসেও কিছু শেখে না, চলাফেরা নোংরা ইত্যাদি ইত্যাদি এই রকম অনেক কথা বললেন। আমরা চুপচাপ শুনলাম, তর্ক করিনি। বিল দিয়ে চুপচাপ চলে এসেছিলাম।
পরে অন্যদের কাছ থেকে জানলাম, তিনি অনেক বছর আগে মাদ্রিদের লাভাপিয়েস বাংলাদেশী অধ্যুষিত থাকতেন, তাই তখন থেকে অনেক বাংলাদেশী তাকে চিনতো। তিনি প্রায় ২০–২৫ বছর ধরে প্রবাসে ছিলেন।
জীবনের অনেক সময় তিনি প্রবাসেই কাটিয়েছেন। কিছুদিন আগে হঠাৎ খবর পেলাম মজিদ চাচা মারা গেছেন। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তার ইরানি স্ত্রী তার লাশ দেশে পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা করেনি। লাশ ফ্রিজে (যেখানে মৃতদেহ রাখা হয়) রেখে দিয়েছিল। পরে বাংলাদেশে থাকা তার পরিবার বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে যোগাযোগ করে লাশ দেশে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে।
তারপর প্রবাসী বাংলাদেশিরাই মিলেমিশে টাকা তুললো, খরচ দিলো, এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাংলাদেশীরাই যাদের থেকে তিনি দুরে থাকতেন, যাদের নিয়ে অভিযোগ করতেন তার লাশ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করলো।
এখানেই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা লুকিয়ে আছে।
মানুষ ভুল করে, মানুষ রাগ করে, মানুষ অভিমান করে, মানুষ দূরে চলে যায় এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের দেশের মানুষকে ঘৃণা করা, নিজের জাতিকে ছোট করা, নিজের মানুষ থেকে দূরে থাকা এগুলো কখনো ঠিক না।
কারণ দিন শেষে বিপদে, অসুস্থতায়, মৃত্যুর পরে, জানাজায়, কবরের সময় নিজের দেশের মানুষই সবার আগে এগিয়ে আসে।
বিদেশে আপনি যত বড়ই হন, যত টাকা-পয়সাই থাকুক, শেষ পর্যন্ত আপনার লাশটা কে ধরবে? আপনার জানাজায় কে দাঁড়াবে? আপনার জন্য কে টাকা তুলবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুব কঠিন না, নিজের দেশের মানুষই।
মজিদ চাচা হয়তো সারাজীবন বাংলাদেশীদের থেকে দূরে ছিলেন, কিন্তু শেষ যাত্রায় সেই বাংলাদেশীরাই তাকে নিজের দেশে ফিরিয়ে দিলো। এটাই বাস্তবতা, এটাই প্রবাস জীবন, এটাই মানুষের সম্পর্কের সত্য।
এই লেখাটা কারো সমালোচনা করার জন্য না, কারো বদনাম করার জন্য না। এই লেখাটা শুধু একটা শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজের মানুষকে ছোট করবেন না। নিজের দেশকে অস্বীকার করবেন না। নিজের মানুষের থেকে দূরে থাকবেন না।
কারণ দিন শেষে নিজের মানুষই পাশে দাঁড়ায়।
আল্লাহ মজিদ চাচাকে ক্ষমা করুন, তার ভুলত্রুটি মাফ করুন এবং জান্নাত নসিব করুন। আমীন


No comments