সংগঠনের নাম “সহযোগিতা”
২০১৭ সাল। চট্টগ্রামের ছোট্ট একটি গ্রামে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল। আশির দশকের শেষ থেকে এখানে যারা বসবাস করছিল, তারা স্থানীয় জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। তবে ২০১৭-১৮ সালের মানবিক সংকট যখন চরমে পৌঁছাল, তখন শরণার্থীদের ঢল গ্রামটির ভারসাম্য নষ্ট করতে শুরু করে।
ঠিক এই সময়ে, “সহযোগিতা” নামে এক সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটি শুরুতে ছিল নিঃস্বার্থ সাহায্যের প্রতীক। সভাপতি মজিদ আর সাধারণ সম্পাদক রহিম দুইজনেই ছিল দেখতে সাদাসিধে মানুষ। রহিমের পকেটে টাকাপয়সার অভাব থাকলেও মানুষের জন্য সাহায্যের ইচ্ছা ছিল অগাধ। মজিদ ছিল বেশ চতুর, কিন্তু তার কথার জাদুতে মানুষ মুগ্ধ হত। সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের অল্প টাকার বিনিময়ে থাকার জায়গা খুঁজে দিতে লাগল। দশ টাকার নাম মাত্র ফি কেউই কষ্ট মনে করত না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে লাগল। মজিদ এবং রহিম সংগঠন স্থানীয়দের নজরে আসতে শুরু করল। একসময় আশেপাশের লোকেরা ভাবল, যদি “সহযোগিতা” ১০ টাকায় জায়গা দিতে পারে, তাহলে আমরা ২০ টাকায় করে নিলে ক্ষতি কী? এরপর আরও কয়েকটি গ্রুপ একই ব্যবসা শুরু করল। জায়গার চাহিদা বাড়তে থাকায় দামও লাফিয়ে বাড়ল। ১০ টাকা থেকে ৫০ টাকা, তারপর ১০০ টাকা, এভাবে জায়গা দেওয়া পুরোপুরি এক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হলো।
মজিদ আর রহিম শুরুতে লাভের ভাগবাঁটোয়ারা না করলেও ২০১৯-২০ সালের মধ্যে সংগঠনের রাজস্ব লক্ষাধিক টাকায় পৌঁছে যায়। তারা নিজেরাও তখন নতুন জায়গা কিনে, বাড়ি বানিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে শুরু করে।
সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষ এলাকায় জায়গা বরাদ্দের ঘোষণা দিল। এই ঘোষণার পরই গ্রামের পরিস্থিতি পাল্টে গেল। শত শত রোহিঙ্গা গ্রামে এসে ভিড় করল। তাদের জায়গা দেওয়ার জন্য আগের ব্যবসায়ী দলগুলো আবার নতুন ফন্দি আঁটল। এবার ৫০/৬০ টাকায় জায়গা দেওয়া শুরু হলো। এরই মধ্যে “সহযোগিতা” সংগঠনটি বেশ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
মজিদ আর রহিম, যাদের নেতৃত্বে একসময় সহযোগিতা শুরু হয়েছিল, এখন মানুষকে টাকা নেওয়ার বিপক্ষে কথা বলছে। তারা বিভিন্ন মিটিং-মিছিল করছে, বক্তৃতায় বলছে:
“মানবতার ব্যবসা বন্ধ করতে হবে! রোহিঙ্গারা আমাদের দায়িত্ব, তাদের জন্য টাকা নেওয়া লোভ ছাড়া কিছু নয়।”
তাদের কথাগুলো শুনতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করলেও অনেকেই জানত, তারা নিজেরাই এই লোভের গোড়াপত্তন করেছিল। তবে মজিদ আর রহিম নিজেদের এতটাই বদলে ফেলেছে যে তারা এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরে এসেছে। তারা মানবিক কাজের স্বীকৃতি পেতে চাইছে। এমনকি নোবেল পুরস্কারের স্বপ্নও দেখে।
বাস্তবতার মুখোমুখি
মজিদ এবং রহিম পুরনো কাজের গল্পগুলো ধীরে ধীরে ফাঁস হতে শুরু করল। স্থানীয়রা যখন তাদের সমালোচনা করত, তখন তারা বলে..
“মানুষ বদলায়, আমরাও বদলেছি। এখন আমাদের উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ।”
এখন ৫০-৬০ হাজার টাকায় জায়গার ব্যবসা যারা চালাচ্ছে , তারা কিছুতেই মজিদ-রহিমের বক্তব্য মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু তারা সরাসরি বলতেও পারছে না.. যে
“মানুষকে নীতির পাঠ দিচ্ছেন, অথচ আপনারাই এই ব্যবসার শুরু করেছিলেন। আজ আমাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বলছেন কেন?”
এভাবে বিতর্ক চলতছে। সত্য হচ্ছে মজিদ আর রহিম একটুও বদলায়নি তারা নতুনভাবে নিজেদের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতেছে।
শেষ কথা
সমাজে “সহযোগিতা”র নাম এখনও টিকে আছে। তবে এর “মান” এখন অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। মজিদ আর রহিম আসলেই নোবেল পাবে কিনা, সেটাও ভবিষ্যতের দেখা যাবে।
এই গল্পটি শুধু একটি গ্রামের নয়; এটি ক্ষমতা, লোভ, এবং মানবতার সংকটের একটি চক্রের প্রতিচ্ছবি।
গল্প সম্পূর্ণ কাল্পনিক, বাস্তবের সঙ্গে মিলে গেলে তা শুধুমাত্র একটি কাকতালীয় ব্যাপার। গল্প বা চরিত্রগুলো তৈরির উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্য করে নয়।

মাদ্রিদ, স্পেন।


No comments