প্রবাসে ঈদ আনন্দের এক ভিন্ন রঙ
ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য ঈদুল ফিতর একটি বিশেষ উৎসব, যা এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। তবে এই আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রিয়জনরা পাশে থাকে।
প্রবাসে ঈদ পালন করা ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। নিজ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা প্রবাসীদের জন্য ঈদ একদিকে যেমন নস্টালজিয়ার, অন্যদিকে তেমনই নতুন সংস্কৃতি ও পরিবেশে এক ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়। তবে যে আনন্দ ও উল্লাস আমরা জন্মভূমিতে ঈদের দিনে অনুভব করি, তা প্রবাসে কিছুটা হ্রাস পায়, কারণ সেখানে প্রিয়জনদের সান্নিধ্য মিস করা হয়।
প্রবাসীদের জীবনে ঈদের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে প্রবাসীদের ঈদের ব্যস্ততা যেন মন খারাপ চাপা দেওয়ার এক উৎসব। বেশিরভাগ প্রবাসীই এই আনন্দময় উৎসবে পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে আর প্রিয়জনদের ছবি দেখেই দিন কাটান।
স্পেনে ঈদ মানে শুধুই নামাজ। নামাজ শেষে কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া, এটি যেন প্রবাসী জীবনের অংশ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ প্রবাসী ঈদের দিনে ছুটি পান না, কিছু সংখ্যক প্রবাসী কেবল ঈদের নামাজের জন্য একটু সময় পান। যারা ছুটি পান, তাদের জন্য ঈদের ছুটি মানেই প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টার বিশ্রাম। ঈদের ছুটিতে পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করাই প্রবাসী ঈদের অন্যতম আনন্দ। তবে, অনেকে ঈদের আগের কয়েকদিন শুধু চিন্তায় থাকেন, আদৌ ছুটি পাবেন কি না।

যারা দীর্ঘদিন ধরে স্পেনে আছেন, তাদের এখানে নতুন বন্ধু তৈরি হয়েছে। ঈদের নামাজ শেষে তারা একে অপরকে আলিঙ্গন করে কুশল বিনিময় করে, তারপর যার যার কাজের দিকে চলে যায়। এইটুকু মিল জন্মভূমির সাথে থাকলেও অন্যসব বিষয়ে ঈদ প্রবাসে বেশ ভিন্ন।
একই চাঁদ, তবে ঈদের আমেজে রয়েছে ভিন্নতা। দূর প্রবাসীদের বেলায় ঈদের আমেজ সম্পূর্ণ ভিন্ন না হলেও অনেকাংশে ভিন্নতা রয়েছে। ঈদের রাতে দেশে যেভাবে প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উল্লাস দেখা দেয়, প্রবাসে তেমনটা দেখা যায় না। প্রবাসীদের জীবনে ঈদের কেনাকাটা বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়ানোর পরিকল্পনা তেমনভাবে থাকে না। তবে, আপনজনদের পিড়াপীড়িতে অনেকে ঈদের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনে ফেলে।
জন্মভূমিতে ঈদের দিন সকাল থেকে বাড়ির ছোট ছোট মিষ্টি মুখের হাসি যেভাবে রঙে রঙে ছড়িয়ে বড়দের মুগ্ধ করে, প্রবাসে সেটি দেখা যায় না। পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে দলবেঁধে ঈদগাহে যাওয়ার সেই বন্ধনটা প্রবাসী জীবনে খুব মনে পড়ে। ঈদের নামাজ শেষে পরিচিত সব মুখদের সঙ্গে কোলাকোলি করার ভ্রাতৃত্বময় দৃশ্য স্মৃতিতে ভাসে। ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া করা, মিষ্টি খাওয়া—এসব সবই স্মৃতিতে রয়ে যায়।
যারা জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশে আছেন, তাদের কাছে ঈদ অনেকটা স্মৃতিচারণের দিনও বটে। মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কাটানো ঈদের মুহূর্তগুলো মনে পড়ে। ঈদের দিন পরিবারের সবার সঙ্গে বসে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া—এসবের অভাব প্রবাসীদের মধ্যে প্রকট হয়ে ওঠে।
মাঝেমাঝে আম্মুর প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যে বলতে হয়। যেমন, কাপড়-চোপড় কিনেছিস বাবা?
আমি: তখন ডিউটিরত অবস্থায়, উত্তরে বলি, "কিনেছি মা।"
আসলে, প্রবাসীদের জন্য এক বেলা প্রশান্তির নিঃশ্বাস নেওয়াটাই দুর্লভ।
ছোটবেলা থেকে আমরা জানি, তিনটি বিষয় সরাসরি আল্লাহর হাতে—জন্ম, মৃত্যু এবং বিবাহ। তবে প্রবাসীদের জন্য যেন আরও একটি বিষয় যোগ হয়—ঈদের দাওয়াত। জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহের মতো ঈদের আমন্ত্রণও অনেকাংশে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। কারণ অনেক প্রবাসীই ঈদের দিনে কাজের কারণে একা থাকে, আবার কেউ কেউ কোথাও দাওয়াত পান না।
যদিও প্রবাসে ঈদের আনন্দ কিছুটা ভিন্ন, তবে আনন্দ খুঁজে নিতে হয় নতুনভাবে। কমিউনিটির সঙ্গে মিলিত হওয়া, দেশীয় খাবার ও সংস্কৃতি ভাগাভাগি করা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—এসবের মাধ্যমে প্রবাসী ঈদকে উপভোগ করেন।
প্রবাসে ঈদ কাটানো মানেই শুধুই মন খারাপ করা নয়, বরং নতুন অভিজ্ঞতা গ্রহণ করা। জন্মভূমি থেকে দূরে থাকলেও ঈদের খুশি ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে আনন্দ খুঁজে নেওয়া সম্ভব। ঈদ হল ভালোবাসা ও সম্প্রীতির উৎসব, যা দূরত্ব ভুলিয়ে সবাইকে একসঙ্গে আনন্দ করতে শেখায়।
আপনি যদি প্রবাসে ঈদ উদযাপন করে থাকেন, তবে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? কেমন লাগে প্রিয়জনদের ছাড়া ঈদের দিন কাটানো? আপনার অনুভূতি আমাদের কাছে লিখে পাঠান।
লেখক
হোসাইন ইকবাল
মাদ্রিদ, স্পেন।




No comments